Trending Now

মুসলিম উম্মাহর পতন যেভাবে

মুসলিম উম্মাহর রয়েছে সোনালি অতীত। মুসলমানরা শ্রেষ্ঠ জাতি, বীরের জাতি, বিজয়ী জাতি। এক সময় বিশ্বের সব বড় বড় পরাশক্তি মুসলমানদের কাছে পরাজিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, মুসলিম উম্মাহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে নির্যাতিত, নিপীড়িত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত ও পরাজিত। কারণ কী? মুসলিম জাতির এমন অধঃপতন কিভাবে হলো? এর অনেক কারণ রয়েছে।

ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়া : আল্লাহর কিছু অলঙ্ঘনীয় অপরিবর্তনীয় মূলনীতি রয়েছে। একটা মূলনীতি হলো, যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করো, তাহলে তিনিও তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা সুদৃঢ় করে দেবেন। (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ৭)

আল্লাহকে সাহায্য করার অর্থ হলো তার দ্বিনের সাহায্য করা, তার শরিয়ত বাস্তবায়ন করা, দ্বিন কায়েমের জন্য সংগ্রাম করা। আজ মুসলমানরা ইসলাম থেকে দূরে সরে গেছে, শরিয়ত বাস্তবায়নের মাধ্যমে আল্লাহকে সাহায্য করছে না। এমতাবস্থায় এই জাতিকে আল্লাহ কেন সাহায্য করবেন? কিভাবে তাদের বিজয় আসবে?

 

ভ্রাতৃপ্রেমের অভাব : মুসলমানরা একে অন্যের ভাই। এমনকি সারা জীবন দেখা না হওয়া বিশ্বের এক প্রান্তের মুসলমানও অন্য প্রান্তের মুসলমানের ভাই। আল্লাহ বলেন, মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। সুতরাং তোমরা ভাইদের মধ্যে শান্তি স্থাপন করো আর আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও। (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১০)

আজ মুসলমানরা একে অন্যের প্রতি ভ্রাতৃত্ববোধ অনুভব করে না, একে অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসে না, একে অন্যের দুর্দিনে কোনো পদক্ষেপ নেয় না। সবাই শুধু নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। অন্য মুসলিম ভাই-বোনদের নিয়ে ভাবারও যেন ফুরসত নেই! অথচ রাসুল (সা.) বলেন, তোমাদের কেউ ততক্ষণ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার (মুসলিম) ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করবে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে। (বুখারি, হাদিস : ১৩; মুসলিম, হাদিস : ৭৫)

পরস্পরের মধ্যে সংঘাত : ভ্রাতৃপ্রেম না থাকার চূড়ান্ত রূপ হচ্ছে পরস্পরের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত। যুগে যুগে মুসলমানরা কাফিরদের হাতে মার খাওয়ার ও পরাজিত হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, বিভেদ-বিভাজন। মুসলিম বিশ্বের প্রায় সব দেশই একটি অন্যটির সঙ্গে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত রয়েছে। মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় তাদের শক্তি হ্রাস পেয়েছে। তাই কাফিররা তাদের ওপর অনায়াসে হামলা করছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ কোরো না, তাহলে তোমরা সাহসহারা হয়ে যাবে এবং তোমাদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ৪৬)

বিলাসিতা ও দুনিয়ায় মজে যাওয়া : মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী এবং আল্লাহর কাছে দুনিয়ার কোনো মূল্য নেই। হাদিসে এসেছে, দুনিয়ার মূল্য যদি আল্লাহর কাছে মাছির একটি পাখার সমমূল্য হতো, তাহলে তিনি কোনো কাফিরকে এক ঢোকও পানি পান করতে দিতেন না। (তিরমিজি, হাদিস : ২৩২০) মুসলমানরা এগুলো জানলেও তাদের বাস্তব জীবনের কর্মকান্ড এর বিপরীত।

অধিকার আদায়ের লড়াই বর্জন : দুনিয়ার প্রতি অত্যধিক ঝুঁকে পড়া ও বিলাসিতায় খুব বেশি ডুবে যাওয়ার ফলে মুসলমানরা অধিকার আদায়ের লড়াই ছেড়ে দিয়েছে। তারা আল্লাহর দেওয়া সংগ্রামের পথ ছেড়ে তথাকথিত শান্তির পথ বেছে নিয়েছে। এটা শান্তি নয়; এটা আত্মসমর্পণ। যে কারণে দেখা যায়, মুসলমানরা সংগ্রাম করতে চাইলেই এই শান্তি বিঘিœত হয়ে যায়, কিন্তু কাফিররা মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করলেও শান্তি বজায় থাকে!
মুসলমানদের জন্য আল্লাহর পথে সংগ্রাম ছেড়ে তথাকথিত শান্তির পথ বেছে নেওয়ার কোনোই সুযোগ নেই। আল্লাহ বলেন, যদি তোমরা (আল্লাহর পথে সংগ্রামে) বের না হও, তবে তিনি তোমাদের বেদনাদায়ক শাস্তি দেবেন এবং তোমাদের পরিবর্তে অন্য এক জাতিকে আনয়ন করবেন।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৯)

যোগ্য ও আদর্শ নেতৃত্বের অভাব : আজ মুসলমানদের আদর্শবান কোনো নেতা নেই। এমন কেউ নেই, যার ডাকে পুরো মুসলিম উম্মাহ ঐক্যবদ্ধ হবে। বর্তমান মুসলমানদের প্রায় সব নেতাই মুনাফিক, পথভ্রষ্ট, দুর্নীতিগ্রস্ত, আদর্শহীন ও জালিম। আল্লাহর একটি নিয়ম হলো, মুনাফিক ও ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের হাতে উম্মাহর বিজয় আসে না। আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের কাজ সার্থক করেন না। (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ৮১)

শত্রুদের সঙ্গে বন্ধুত্ব : বর্তমানে মুসলিমদের মধ্যে এই ব্যাধিটা ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। মুসলমানরা আল্লাহর জন্যই বন্ধুত্ব এবং আল্লাহর জন্যই শত্রুতা-এই আকিদা ভুলে গিয়েছে। আজ তারা নিজেদের শত্রুদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছে। শান্তিচুক্তির নামে ইহুদি-খ্রিস্টানদের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে। অথচ আল্লাহ বলে দিয়েছেন, হে মুমিনরা, তোমরা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ কোরো না। তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে কেউ তাদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে সে নিশ্চয়ই তাদেরই একজন। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদের হিদায়াত দেন না। (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৫১)

যথাযথ শুরাব্যবস্থা না থাকা : মুসলমানদের শাসন পরিচালনার অন্যতম মানদন্ড শুরা পরিষদ। শুরাব্যবস্থা ছাড়া একনায়কতন্ত্র কায়েম করা ইসলামী শরিয়তবিরোধী। আল্লাহ রাসুল (সা.)-কে নির্দেশ দিয়ে বলেন, আর কাজে-কর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করো। (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)
এগুলো মুসলমানদের অধঃপতিত, লাঞ্ছিত, নির্যাতিত-নিপীড়িত হওয়ার মৌলিক কয়েকটি কারণ। এগুলো মুসলিম উম্মাহর ব্যাধি। মুসলিম উম্মাহর অবস্থার উত্তরণে এসব ব্যাধির যথাযথ চিকিৎসার বিকল্প নেই।

About STAR CHANNEL

Check Also

রোগব্যাধি মুমিনের জীবনকে গুনাহমুক্ত করে

দুনিয়াবি কষ্টগুলো এক ধরনের পরীক্ষা। আল্লাহ কখনো সুখ-শান্তি দিয়ে পরীক্ষা করেন, আবার কখনো রোগব্যাধি দিয়ে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *