Trending Now

কে এ নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করবে

রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই। আর সেই গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব কেবল সরকারের একার নয়। সরকারি দল ও প্রধান বিরোধী দলসহ প্রতিটি রাজনৈতিক দলকেই এ দায়িত্ব নিতে হবে। গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বিশ্বাস করতেন, দেশ শাসনের প্রশ্নে জনগণই শেষ কথা। এ আপ্তবাক্য মাথায় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মসূচি প্রণয়ন করবে ও গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষাকে গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করবে- এটিই কাম্য।

এটা বিস্মৃত হলে চলবে না, পাকিস্তানের জন্মের পরপর ধর্মান্ধতার গহীন অন্ধকারে রেখে গণতান্ত্রিক অধিকার-বিচ্যুত করে দেশ শাসনের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ, বিশেষ করে ছাত্রসমাজ অকুতোভয়ে রুখে দাঁড়ায়। প্রায় ৭৩ বছর আগের ঘটনা হলেও যা আজও প্রদীপ্ত নক্ষত্রের মতো আলো ছড়ায়। যে বাঙালি শেরেবাংলার কৃষক প্রজা পার্টিকে পাশ কাটিয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগকে ভোট দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করে বৃহত্তর সিলেটকে ভোটের মাধ্যমে আসাম থেকে বিযুক্ত করে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করে, কোটি কোটি বাঙালির চোখে-মুখে হৃদয়ে ব্যাপ্তি ও বিকাশে কী চরম উন্মাদনা ও উত্তেজনা। তখনকার ৫৪ হাজার বর্গমাইলের পূর্ব পাকিস্তান প্রাপ্তিতেই খুশিতে টগবগে, আহ্লাদে আটখানা। অথচ রাজনীতিতে জিন্নাহ সাহেব একগুঁয়েমি বা গোঁয়ার্তুমি না করলে রেডক্লিফের দেশ বিভাগের মানচিত্র অঙ্কনে কলকাতা, মুর্শিদাবাদ ও মালদহ পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হতে পারত। এখানে বলে রাখা অত্যাবশ্যকীয়, কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভীষণ বড় মাপের ব্যক্তিত্ব ছিলেন। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই ছিপছিপে গড়নের লম্বা ভদ্রলোকটি রাজনীতিতে খুব দৃঢ়চেতা, একগুঁয়ে এবং আপসহীন ও প্রত্যয়দৃঢ় চিত্তের পরিচয় দিয়েছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন কর্মী হিসেবে জীবনসায়াহ্নে এসেও তাঁকে সাধুবাদ জানাব সংগত কারণে, ১৪০০ মাইলের ব্যবধানে দুটি অঙ্গের সমন্বয়ে (পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান) একটি উদ্ভট ও অভূতপূর্ব রাষ্ট্রের জন্ম না হলে পরে ঘোর উন্মাদনার জের কাটতে না কাটতেই বাঙালি জাতীয় চেতনার উন্মেষ, ব্যাপ্তি ও বিকাশ ঘটিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় সম্ভব হতো না। এ অঞ্চলের অনেক রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্র বিশেষজ্ঞ বলেছেন, জিন্নাহ সাহেব ইচ্ছা করেই কলকাতা, মুর্শিদাবাদ ও মালদহকে ভারতবর্ষকে ছেড়ে দিয়েছেন। কারণ, তাহলে পূর্ব পাকিস্তান আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত হতো এবং কলকাতাকেই পাকিস্তানের রাজধানী করতে হতো। পূর্ব পাকিস্তান ও বাঙালির প্রতি জিন্নাহ সাহেবের মানসিকতা রূঢ় হলেও পাকিস্তান সৃষ্টির প্রশ্নে তাঁর অবিসংবাদিত ব্যক্তিত্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় তাঁর প্রত্যয়দৃঢ় ও অভাবনীয় কুশলী চিন্তা বিশ্ব ইতিহাসের একটি ঐতিহাসিক ঘটনাই বটে।

আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, মহাত্মা গান্ধীই জিন্নাহ সাহেবকে কায়েদে আজম, অর্থাৎ মহান নেতা বিশেষণে ভূষিত করেছিলেন। ইতিহাস থেকে এও জানা যায়, ভারত বিভক্ত না করলে গান্ধীজি জিন্নাহ সাহেবকে অবিভক্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী বানাতেও চেয়েছিলেন। এতে একদিকে গান্ধীজির মহান আত্মা, অন্যদিকে জিন্নাহ সাহেবের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় সুদৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ের পরিচয় পাওয়া যায়। জিন্নাহ সাহেব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সংগঠন মুসলিম লীগের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন। অথচ অবিভক্ত বাংলার প্রিমিয়ার গণতন্ত্রের অগ্রদূত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে অতি সন্তর্পণে পাশ কাটিয়ে নবাব পরিবারের নেতা খাজা নাজিমউদ্দিনকে তিনি আস্থায় নিয়েছিলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গণমুখী রাজনীতি ও জনপ্রিয়তা জিন্নাহ সাহেবের মনে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল কি না বলা দুষ্কর। কিন্তু শহীদ সোহরাওয়ার্দী সব সময় জিন্নাহ সাহেবের প্রতি নিগূঢ় শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। ভারতবর্ষে গাঢ় নীল রক্তের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও কী করে তিনি ধাঙড় ও ডকশ্রমিকদের নিয়ে রাজনীতি শুরু করেন তা ভাবলে বিস্ময়াভিভূত হতে হয়। এ বাংলার আরেক সিংহপুরুষ শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাবের উপস্থাপক হওয়া সত্ত্বেও অনেকটা মুসলিম লীগের বাইরে থেকে বাংলার মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় প্রতিস্থাপিত সিংহাসনে তাঁর আসন করে নিতে পেরেছিলেন। ঋণ সালিসি বোর্ড গঠন, জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি ও সমগ্র বাংলায় শিক্ষার আলো ছড়ানো – বিশেষ করে মুসলমানদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাঁর অনবদ্য অবদান বাংলার প্রধানমন্ত্রিত্বের চাইতেও ইতিহাসে তাঁকে সম্মানিত ও অবিস্মরণীয় অবস্থানে জাজ্বল্যমান রাখতে পেরেছে। তখনকার রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে জিন্নাহ সাহেবের ব্যক্তিত্বের সমান্তরাল ধারায় হিমাচলের মতো মাথা উঁচু করে শেরেবাংলা তাঁর রাজনীতির অবিশ্রান্ত ধারাকে অব্যাহত রেখেছেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমউদ্দিন সাহেব মুসলিম লীগ করতেন এবং তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার দুই জাঁদরেল নেতা হিসেবে প্রদীপ্ত সূর্যরশ্মির মতো তদানীন্তন বাংলার মানুষের, বিশেষ করে মুসলমানদের মধ্যে আলো ছড়িয়েছেন। মুসলিম লীগ করলেও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী চেতনায়, মননশীলতায় ও রাজনৈতিক দীক্ষায় একান্তভাবেই অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। নাজিমউদ্দিন সাহেব যখন প্রাসাদকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতিভূ ছিলেন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন ধাঙড় ও ডকশ্রমিকদের সংগঠিত করার উদারপন্থি রাজনীতির সূর্যসন্তান হিসেবে প্রতিভাত হন। তাঁর রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। আইনজীবী হিসেবে চিত্তরঞ্জন দাশ তৎকালীন ভারতবর্ষে শুধু প্রথিতযশাই ছিলেন না, এক অনবদ্য কিংবদন্তি ছিলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু দেশবন্ধুর নিগূঢ় ছায়ায় ভারতীয় রাজনীতিতে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠেন এবং কালে কালে নিজ নিজ অবস্থানে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু লড়াই করে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতেন। লড়াইয়ের লালিত স্বপ্ন বক্ষে লালন করেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী জাপানি শক্তির সাহায্যে গৃহবন্দী অবস্থান থেকে পলায়ন করে চিরকালের জন্য হারিয়ে গেলেন। তাঁর হারিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তী অবস্থান নিয়ে ভারতবর্ষে আজও নানা প্রকার কল্পকাহিনি প্রচারিত আছে।

 

সে যাই হোক, সোহরাওয়ার্দী সাহেব রাজনীতিতে যে সুদৃঢ় ভূমিকা পালন করেছেন, জিন্নাহ সাহেব তার কোনো স্বীকৃতি ও সম্মান প্রদানের প্রয়োজন বোধ করেননি। তাই অবিভক্ত পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী সরদার হায়াত খান পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরে অনায়াসেই পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী থেকে গেলেন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্নে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে মুখ্যমন্ত্রিত্ব দূরে থাক, তিনবার তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে তাঁকে প্রবেশ করতেই দেওয়া হলো না। ওদিকে হিন্দু মহাসভার ডাকে ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডের নামে কলকাতা ও আশপাশে বলতে গেলে সারা বাংলাতেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করা হলো। যার ফলে অসংখ্য জীবন নাশ ও ধনসম্পদ লুণ্ঠিত হলো। পূর্ব পাকিস্তানের ধনী বর্ণাঢ্য হিন্দুরা প্রায় শূন্য হাতেই কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় আশ্রয় নিলেন। তবে এ কথাও সত্য, পূর্ব পাকিস্তানের প্রবাসী হিন্দুরা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে প্রচ- প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রফুল্ল রায়সহ কয়েকজন মুখ্যমন্ত্রীও হতে পেরেছিলেন। বাম রাজনীতিতে সবচাইতে সফল ব্যক্তিত্ব জ্যোতি বসুর পরিবারও পূর্ব বাংলার নারায়ণগঞ্জের অধিবাসী ছিলেন।

অনেক বাধা-বিপত্তির পাহাড় ডিঙিয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থান নেওয়ার মুহূর্ত থেকেই অনুধাবন করেন জিন্নাহ সাহেবের একক নেতৃত্বে পরিচালিত গণতন্ত্রশূন্য পাকিস্তানে মানুষের অধিকার অর্জন করতে হলে গণতান্ত্রিক বিরোধী দল অত্যাবশ্যকীয়। এর তাগিদেই তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা করেন। সর্বজনাব মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, জহিরউদ্দিন খান, আবদুস সালাম খান, খাজা খয়রাত হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ, আতাউর রহমান খান, টাঙ্গাইলের শামসুল হক এবং তাঁর অত্যন্ত আস্থাভাজন ও স্নেহের শেখ মুজিবসহ অন্যান্য নেতা ও কর্মীবৃন্দকে নিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগের সূচনা হয়। পরবর্তীতে মুসলিম শব্দটি প্রত্যাহার করে ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর বৈরুতে সোহরাওয়ার্দী সাহেব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত তাঁরই অমোঘ ও অবিসংবাদিত নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথপরিক্রমণ অবিচল ধারায় চলতে থাকে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাংগঠনিক প্রতিভা এতই সুতীক্ষè ছিল যে, ’৫৪-এর নির্বাচনে তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা যুক্তফ্রন্টের কাছে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটে।

সোহরাওয়ার্দী সাহেব খুবই দূরদর্শী ও কুশলী নেতা ছিলেন। তিনি যুক্তফ্রন্টের রূপকার ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক হওয়া সত্ত্বেও হক-ভাসানীর নেতৃত্বকেই সামনে ঠেলে দেন। শেরেবাংলার অলঙ্ঘনীয় জনপ্রিয়তা এবং আসাম থেকে ডেকে আনা মওলানা ভাসানীর ইসলামী লেবাস ও চেহারাই মুসলমানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী কৌশলগত পারদর্শিতা দেখাতে পেরেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি ও স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবেই কেবল নয়, বরং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র এবং রাজনীতির একজন শিক্ষানবিশ হিসেবে আমি মনে করি, এ দেশে গণতন্ত্রের জনক ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তাঁর চিন্তা-চেতনা ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডে এটি সত্যই প্রতিভাত হয়েছে- রাজনীতিতে জনগণই শেষ কথা। এ বিশ্বাস ও প্রতীতিকে সমস্ত অন্তর ও সত্তা দিয়ে ধারণ করতে শিখেছিলেন তাঁর অতীব প্রিয় দুই শিষ্য মানিক ও মুজিব। তিনি মানিকের হাতে কলম, অর্থাৎ ইত্তেফাক তুলে দেন আর মুজিবের হাতে মাঠ, অর্থাৎ সংগঠন গড়ে তোলার গুরুভার অর্পণ করেন। তিনি তাঁর দক্ষিণহস্ত হিসেবে কাজে লাগান শেখ মুজিবকে।

সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রবাদ হিসেবে একটি সত্য সূর্যালোকের মতো প্রতিভাত- হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একটি কলম আর একটি মাঠ এ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ব্যাপকভাবে সাহায্য করেছিল। মানিক আর মুজিবের সমন্বয় ঘটাতে না পারলে এ দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন কোথায় গিয়ে দাঁড়াত, আজকের দিনে তা কল্পনারও অতীত।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও তাঁর ভাবশিষ্য মানিক ও মুজিবের দেশে আজ গণতন্ত্রের ভাগ্য অত্যন্ত বিপন্ন। পাকিস্তান আমলে সামরিক জান্তা বারবার দেশ শাসন করেছে, গণতন্ত্রকে অবরুদ্ধ করেছে। কিন্তু শক্তিশালী বিরোধী দল ও গণতন্ত্রকে উদ্ধার করতে গিয়ে রাজপথের মিছিলে মুষ্টিবদ্ধ উত্তোলিত হাত জনগণের অধিকারের সপক্ষে সেøাগান; পল্টন ময়দান থেকে সারা বাংলার জেলা, মহকুমা, থানাসহ কন্দরে কন্দরে সভা আর সেøাগান জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে জাজ্বল্যমান রেখেছে। পাকিস্তানের সেই যুগান্তকারী গণআন্দোলনের সঙ্গে যাদের বিন্দুমাত্র পরিচয় আছে বা ইতিহাস থেকে অবিকৃত ধারায় ন্যূনতম পাঠ নিয়েছেন, তারা নির্দ্বিধায় স্বীকার করবেন, এ দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারার প্রচলন করেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর বৈরুতে তাঁর রহস্যজনক মৃত্যুর পর সময়ের স্রোতধারায় সে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তাঁর সবচাইতে আস্থাভাজন প্রিয় কর্মী শেখ মুজিবুর রহমান। সোহরাওয়ার্দী সাহেব জীবিত থাকতেই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বক্তব্য তুলে ধরার খাতিরে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে ইত্তেফাক প্রকাশ করার নির্দেশ প্রদান করেন। শেখ মুজিব রইল সংগঠন গড়ে তোলার কারিগর হিসেবে আর মানিক রইল ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠার সুদৃঢ় ব্রতে।

এ দুই ব্যক্তিত্বের মাঝে অসংখ্য তেজোদ্দীপ্ত সাহসী মুখের সংযোগ ঘটিয়েছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। মওলানা ভাসানী, মওলানা তর্কবাগীশ, জহিরউদ্দিন সাহেব, আবদুস সালাম খান, খাজা খয়রাত হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ, আতাউর রহমান খান, টাঙ্গাইলের শামসুল হকসহ অসংখ্য তাজা দীপ্ত প্রাণ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে শক্তি জোগায় পাকিস্তানের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক আন্দোলন সুচারুরূপে পরিচালনায়। এখানে যে কথাটি আমি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে আগ্রহী, সেদিন শুধু জিন্নাহ সাহেবই নন, আইয়ুব, মোনায়েম, ইয়াহিয়া খানসহ অসংখ্য স্বৈরাচারী শাসক পাকিস্তানের ক্ষমতার মসনদ দখল করে গণতন্ত্রকে নিস্তব্ধ ও নিস্পৃহ করে দিতে চেয়েছে। কিন্তু শক্তিশালী বিরোধী দল সেই ভিন্ন অপচেষ্টার শুধু প্রতিবাদই করেনি, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পৃষ্ঠপোষকতা এবং হক-ভাসানীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ঐক্য যুক্তফ্রন্ট নামে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো রাজনৈতিক মহা-প্রকৌশলীর যে বিজয় ও সাফল্য গণতন্ত্রের তরণীকে সৈকতে ভিড়িয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ’৭০-এর নির্বাচনে আরেকটি অবিস্মরণীয় ও সারা পৃথিবীর কাছে অভাবনীয় বিজয় ছিনিয়ে এনে দেয়। সে বিজয়ের মহানায়ক ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী কর্ণধার সমগ্র পাকিস্তানের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার অগ্নিপুরুষ শেখ মুজিব স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার আন্দোলনে উত্তরণের প্রশস্ত পথ বিনির্মাণ করেন। যদি বলি পাকিস্তানিদের অন্ধ দাম্ভিকতা, অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং সবার ওপর ’৭০-এর নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট আমাদের স্বাধীনতার সিংহদ্বার উন্মোচিত করে, তাহলে অত্যুক্তি হবে না।

এ নিবন্ধের মূল লক্ষ্য হলো, নতুন প্রজন্মকে জানান দেওয়া, যখনই ব্যক্তিশাসনের নিষ্ঠুর নির্মমতা দেশকে গ্রাস করেছে, তখনই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে জাগ্রত জনতা সংগঠিত হয়েছে, অকুতোভয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমেই স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে, একনায়ককে নির্বাচন দিতে বাধ্য করেছে, এমনকি জনসংখ্যার ভিত্তিতে জাতীয় সংসদের আসনও নির্ধারণ করতে হয়েছে। সে গণতন্ত্র আজ বড়ই বিপন্ন। তবু মানুষের মধ্যে কোনো প্রতিবাদ নেই। কেন জানি না, মানুষকে ভিসুভিয়াসের মতো জ্বলে উঠতে দেখা যায় না। নির্বাচনের আগেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে যায়। তবু মানুষ প্রতিবাদহীন, নীরব, নিথর, নিস্তব্ধ। যোগ্য নেতৃত্বের অভাব ও নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীনতাই আজকের এ স্থবিরতার মূল কারণ। ইনটেনসিভ কেয়ারে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর মতো গণতন্ত্র এখন সংজ্ঞাহীন। কে এ নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করবে- সেটিই এ দুঃসময়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

About STAR CHANNEL

Check Also

করোনা ও ঈদ দীর্ঘশ্বাস বাড়াচ্ছে চরের হতদরিদ্র মানুষের

করোনা প্রভাবে কর্মহীন চরাঞ্চলের মানুষের ঈদ আনন্দ ফ্যাকাসে হতে বসেছে। ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে তাদের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *